সাল ২০১৪। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘জাতিস্মর’ মুক্তি পেয়েছে। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপরীতে তিনি। সেই শেষ। তার আগে তাঁর কাজ ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘নৌকোডুবি’, ‘আবহমান’ কিংবা সুব্রত সেনের ‘রোগা হওয়ার সহজ উপায়’ ছবিতে। রিয়া সেন। লম্বা বিরতির পর সদ্য উত্তর কলকাতায় শুটিং সেরে গেলেন।
বাইরে তাপপ্রবাহ। তিনি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মেকভ্যানের অন্দরে। সাদা হাতাকাটা টপ আর জিন্স শোভিত। একটু দূরে হ্যাঙারে তাঁর ব্লেজার ঝুলছে। অনুপ দাসের ‘রেখা’ ছবিতে এটাই তাঁর লুক। রিয়া রূপটান নিতে ব্যস্ত। এখনও কোমরছোঁয়া চুল! বিয়ের পরেও ছিপছিপে শরীরে মেদ জমতে দেননি! এত দিন কোথায় ছিলেন? প্রশ্ন করতেই চেনা ভঙ্গিতে চোখ নাচিয়ে বললেন, “আমেরিকায় ছিলাম। মডেলিং করলাম। ময়াঙ্ক শর্মার একটি সিরিজের শুটিং চলছে সেখানে। সেই কাজ করে এলাম।”
আরও পড়ুন:
test
শ্যামবাজারে প্রতিবাদ ধর্না! পথে ঋতুপর্ণা-সায়ন, বিদেশ থেকে উড়ে এলেন ‘অন্তঃসত্ত্বা’ রিয়া
কেমন আছেন রিয়া? ঘোরতর সংসারী? প্রশ্ন করতেই হাসি। রিয়া বললেন, “নিজেকে মেলে ধরার চেষ্টা করছি নানা ধরনের কাজে। নানা জায়গায় বেড়াচ্ছি। নিজেকে সমসাময়িক রাখার চেষ্টা করছি।” তার পর গোপন তথ্য ফাঁস করার ভঙ্গিতে জানালেন, হলিউডে পা রাখার চেষ্টাও করছেন! তার পরেই ফিরিয়ে প্রশ্ন করলেন, “বাংলার খবর বলুন! রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। টলিউডেও নাকি বদল আসছে?” বলেই মুচকি হাসি। তার পর নিজেই বলে উঠলেন, “বদল আসা উচিত। ইন্ডাস্ট্রিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এই বদল খুবই জরুরি।” রিয়ার সাফ জবাব, নিজের রাজ্য, নিজের শহর থেকে অনেক দিনই দূরে তিনি। কিন্তু দিদি রাইমা সেন, মা মুনমুন সেনের থেকে নিয়মিত খবর নেন। সেই জায়গা থেকে তাঁর মনে হয়েছে, সকলের আগে ‘ব্যান’ সংস্কৃতি তুলে দেওয়া উচিত। সবাই যেন কাজ পান। অন্য রাজ্য, অন্য দেশের মানুষ যেন কলকাতায় এসে কাজ করতে চান। রিয়ার কথায়, “দেখুন, আমি না তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে সুবিধা পেয়েছি। না বিজেপি-র থেকে কোনও রকম সুবিধা পাব। আমার উপলব্ধি, এ সবে ব্যস্ত না থেকে সবার মন দিয়ে কাজ করা উচিত।”
শুটে ঈশান মজুমদার, রিয়া সেন এবং জনৈক শিশুশিল্পী।
শুটে ঈশান মজুমদার, রিয়া সেন এবং জনৈক শিশুশিল্পী। নিজস্ব চিত্র।
অথচ মুনমুন সেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ ছিলেন! রিয়া-রাইমা মায়ের হয়ে প্রচারে যোগ দিয়েছিলেন। অভিনেতাদের রাজনীতিতে আসা নিয়ে সেই জন্যই কি তাঁর মনে দ্বিধা রয়েছে? দীর্ঘ দিন পরে নিজের শহরে পা রেখে অনর্গল সেন বাড়ির ছোট কন্যা। বললেন, “কলকাতায় সিনেমা, সংস্কৃতি এবং রাজনীতি বরাবরই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। কারণ এখানে শিল্প ও জনজীবন স্বাভাবিকভাবেই একে অপরকে প্রভাবিত করে। আমার মনে হয়, অভিনেতা এবং রাজনীতিবিদদের মধ্যে অনেক মিলও রয়েছে। নানা দিক থেকে, সব অভিনেতাই রাজনীতিবিদ এবং সব রাজনীতিবিদই অভিনেতা।” তার পরেও তিনি মনে করেন, “যদি কোনও রাজনৈতিক পরিবর্তন একটি ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন প্রাণশক্তি, টিমওয়র্ক এবং নতুন ধারণা নিয়ে আসে, তা হলে সেই বদল ভাল। পরিবর্তন এবং নতুনত্বই যে কোনও সৃজনশীল ক্ষেত্রকে সজীব রাখে।” তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি রাজনীতিতে যুক্ত থাকার চেয়ে নিজের কাজে মনোযোগ দেওয়া বেশি পছন্দ করেন। তার জন্য সকলের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখাটাও প্রয়োজন বলে মনে করেন রিয়া।
পরিবর্তিত টলিউড যদি রিয়াকে আবার ডাকে, অভিনেত্রী কি সাড়া দেবেন? দীর্ঘ দিন তিনি বাংলা বিনোদনদুনিয়া থেকে দূরে। এ বার আর ক্ষোভ চেপে রাখতে পারলেন না রিয়া। সপাট বললেন, “কোনও পরিচালক ভরসাই করতে পারেন না, আমিও যে ভাল চরিত্র পেলে নিজেকে উজাড় করে দিতে পারি। সেই ভরসা তো আমার উপরে রাখতে হবে। ঋতুপর্ণ ঘোষ রেখেছিলেন। তাই তাঁর ছবি ‘আবহমান’-এ আমার অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল।” তিনি একা নন, তাঁর দিদি রাইমাকেও টলিউড যোগ্য সম্মান দিতে পারেনি, অনুযোগ রিয়ার। তার পরেই ফাঁস করলেন, “নন্দিতা রায়-শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘ফুলপিসি ও এডওয়ার্ড’ ছবিতে রাইমা খুব ভাল চরিত্র পেয়েছে। যদিও ওই চরিত্র আমার করার কথা ছিল। তখন আমি দেসে ছিলাম না। দিদি কাজ করে বলল, ওঁরা খুব ভাল। কাজ করে তৃপ্তি পেয়েছে।” হয়তো আগামী দিনে তাঁকে নন্দিতা-শিবপ্রসাদের ছবিতে দেখা যেতে পারে, আভাস দিলেন তার।
রিয়ার দাবি, “পারেন না। আর পারেন না বলেই, একই ধারার চরিত্রে আমায় ভাবেন, ডাকেন। সাধে আমি বাংলা থেকে দূরে?” চোখের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়া চুলের গোছা সরাতে সরাতে বলে উঠলেন তিনি, “আপনারা তো আবার সর্বত্র ‘নেপোটিজ়ম দেখত পান!’ সব ইন্ডাস্ট্রিতে যদি ‘নেপোটিজ়ম’ই থাকে তা হলে বলুন, সুচিত্রা সেনের নাতনি, মুনমুন সেনের মেয়ে হয়ে আমি কী পেলাম? আজীবন আপনারা শুধু এই দুটো নামের সঙ্গে আমায় বেঁধে রাখলেন! কাজের কাজ কিচ্ছু হল না।” বলতে বলতে থামলেন রিয়া। বড় করে শ্বাস নিলেন। নিজেকে সামলে উদাহরণ দিলেন তাঁর সঙ্গে ঘটা একটি ঘটনার। নাম না করে জানালেন, এক বাঙালি পরিচালকের হিন্দি সিরিজ়ে তাঁকে কাজের জন্য নেওয়া হয়েছিল। নায়িকা নন, তবে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। রিয়ার কথায়, “শুটিং চলাকালীন আমার বাবা ভরত দেববর্মন প্রয়াত। পরিচালক কিন্তু ছুটি দেননি! পরের দিন আমায় দিয়ে শুটিং করালেন। সেটে গিয়ে দেখি, নায়ক নুডলস খেতে ব্যস্ত। তাঁর খাওয়া হলে শট দিতে গেলাম।” সিরিজের ট্রেলার দেখে রিয়া হতবাক! প্রচার ঝলকের কোথাও নেই তিনি। সে দিন খুব কষ্ট পেয়েছিলেন তিনি।
রূপটান নেওয়া প্রায় সারা। কেশবিন্যাস চলছে অভিনেত্রীর। ওই অবস্থাতেই রিয়া ঘুরে বসলেন। বলে উঠলেন, “আপনারা জানেন না, ‘নেপোটিজম’ নয়, সর্বত্র ‘গ্রুপিসিজ়ম’ চলছে। বাইরে থেকে লোক আসছেন। তাঁরা দল বানাচ্ছেন। সেই দলের লোকেরাই মুঠোভর্তি কাজ পাচ্ছেন। ওই জন্যই একটু আগে বললাম, সকলে যেন কাজ পায়। কিছু মানুষ কাজ পাবেন, কিছু মানুষ বসে থাকবেন, এটা ঠিক?” কিন্তু এই ‘সেন’ পদবিই তো তাঁকে বলিউডে জায়গা করে দিয়েছে? একেবারেই না! তীব্র প্রতিবাদ তাঁর। রিয়ার মতে, তাঁর পরিশ্রম তাঁকে জায়গা করে নিতে সাহায্য করেছে। কথাপ্রসঙ্গে উঠে এসেছে তাঁর সহ-অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুপ্রসঙ্গও। আকস্মিক মৃত্যুর জন্য অনেকেই দায়ী করছেন অভিনেতা যে প্রযোজনা সংস্থার হয়ে কাজ করছিলেন, তাদের অসাবধানতা, অপেশাদার মনোভাবকে। রিয়ারও কি তা-ই মত? অভিনেত্রী বললেন, “আমি বিশ্বাস করি, জন্ম এবং মৃত্যু দুটোই আমাদের ভাগ্যে লেখা থাকে।” একই সঙ্গে তিনি টলিউডকে পুরোপুরি ‘অপেশাদার’ তকমা দিতেও রাজি নন। রিয়া মনে করেন, সেটে শৃঙ্খলা এবং সময় ব্যবস্থাপনার অভাব হয়তো রয়েছে। সেটা না থাকলে রাহুলের পরিণতি এ রকম ভয়াবহ হত না।
টলিউড অপেশাদার নয়। সবাই নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করে এবং আরও ভালো পরিস্থিতিতে কাজ করতে চায়। টলিউড, অর্থাৎ বাংলা সিনেমা থেকে যে কাজগুলো বেরিয়ে আসে, তা সত্যিই অতুলনীয়। তবে আমার মনে হয়, সেটে শৃঙ্খলা এবং সময় ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে।”
লম্বা সময় অভিনয়দুনিয়ায় কাটানোর পরেও মনের মতো কাজ পান না। মনের মতো চরিত্রও। রিয়া কি হতাশ? এখন কি তাঁর মনে হয়, অভিনয়ে না এলেই পারতেন! অভিনয়দুনিয়ায় টিকে থাকতে, আকর্ষণ বজায় রাখতে দর্শক-অনুরাগীদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা উচিত? তাঁর দিদা সুচিত্রা সেন আজীবন যা মেনেছিলেন। রিয়া আবার খোশমেজাজে। কণ্ঠস্বরে কোনও উষ্মা নেই! মিষ্টি হেসে পরিণত উত্তর দিলেন, “এই ইন্ডাস্ট্রিতে আমার জীবনে উত্থান-পতন দুটোই এসেছে। কিন্তু বিদেশে অভিনেতা এবং মডেল হিসেবে কাজ করার সুবাদে আমি খারাপ সময়গুলোকে মেনে নিতে, তার থেকে শিক্ষা নিতে এবং ভাল সময়গুলোকে পুরোপুরি উপভোগ করতে শিখে গিয়েছি।” পরিণত রিয়া বুঝতে শিখেছেন, প্রত্যেক অভিনেতার পথচলা ভিন্ন। সেই পথ নির্ভর করে, তাঁরা কোন পথ বেছে নেন তার উপর। তাঁর কথায়, “এমন অনেক একনিষ্ঠ দর্শক আছেন, যাঁরা আপনাকে দেখে কখনও ক্লান্ত হন না। কিন্তু এখন শুধু সেটাই যথেষ্ট নয়।” তাই তাঁর বিশ্বাস, অতীত কেমন ছিল সে দিকে ক্রমাগত ফিরে না তাকিয়ে সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াটাই ভাল। কারণ, বদল, পরিবর্তন— এ গুলো আসবেই।
ঠিক সেই সময় রিয়ার সঙ্গে দেখা করতে এলেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী তপতী মুন্সী। তিনিও রিয়ার সঙ্গে এই ছবিতে আছেন। তাঁকে দেখেই সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন রিয়া। বর্ষীয়ান অভিনেত্রীর দুটো হাত ধরে আন্তরিক ভাবে জানতে চাইলেন, “কেমন আছ?” সেই আন্তরিকতায় অভিনয়ের ছিটেফোঁটা নেই। বরং চুঁইয়ে পড়েছে সেন বাড়ির শিক্ষা।
বাইরে তাপপ্রবাহ। তিনি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মেকভ্যানের অন্দরে। সাদা হাতাকাটা টপ আর জিন্স শোভিত। একটু দূরে হ্যাঙারে তাঁর ব্লেজার ঝুলছে। অনুপ দাসের ‘রেখা’ ছবিতে এটাই তাঁর লুক। রিয়া রূপটান নিতে ব্যস্ত। এখনও কোমরছোঁয়া চুল! বিয়ের পরেও ছিপছিপে শরীরে মেদ জমতে দেননি! এত দিন কোথায় ছিলেন? প্রশ্ন করতেই চেনা ভঙ্গিতে চোখ নাচিয়ে বললেন, “আমেরিকায় ছিলাম। মডেলিং করলাম। ময়াঙ্ক শর্মার একটি সিরিজের শুটিং চলছে সেখানে। সেই কাজ করে এলাম।”
আরও পড়ুন:
test
শ্যামবাজারে প্রতিবাদ ধর্না! পথে ঋতুপর্ণা-সায়ন, বিদেশ থেকে উড়ে এলেন ‘অন্তঃসত্ত্বা’ রিয়া
কেমন আছেন রিয়া? ঘোরতর সংসারী? প্রশ্ন করতেই হাসি। রিয়া বললেন, “নিজেকে মেলে ধরার চেষ্টা করছি নানা ধরনের কাজে। নানা জায়গায় বেড়াচ্ছি। নিজেকে সমসাময়িক রাখার চেষ্টা করছি।” তার পর গোপন তথ্য ফাঁস করার ভঙ্গিতে জানালেন, হলিউডে পা রাখার চেষ্টাও করছেন! তার পরেই ফিরিয়ে প্রশ্ন করলেন, “বাংলার খবর বলুন! রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। টলিউডেও নাকি বদল আসছে?” বলেই মুচকি হাসি। তার পর নিজেই বলে উঠলেন, “বদল আসা উচিত। ইন্ডাস্ট্রিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এই বদল খুবই জরুরি।” রিয়ার সাফ জবাব, নিজের রাজ্য, নিজের শহর থেকে অনেক দিনই দূরে তিনি। কিন্তু দিদি রাইমা সেন, মা মুনমুন সেনের থেকে নিয়মিত খবর নেন। সেই জায়গা থেকে তাঁর মনে হয়েছে, সকলের আগে ‘ব্যান’ সংস্কৃতি তুলে দেওয়া উচিত। সবাই যেন কাজ পান। অন্য রাজ্য, অন্য দেশের মানুষ যেন কলকাতায় এসে কাজ করতে চান। রিয়ার কথায়, “দেখুন, আমি না তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে সুবিধা পেয়েছি। না বিজেপি-র থেকে কোনও রকম সুবিধা পাব। আমার উপলব্ধি, এ সবে ব্যস্ত না থেকে সবার মন দিয়ে কাজ করা উচিত।”
শুটে ঈশান মজুমদার, রিয়া সেন এবং জনৈক শিশুশিল্পী।
শুটে ঈশান মজুমদার, রিয়া সেন এবং জনৈক শিশুশিল্পী। নিজস্ব চিত্র।
অথচ মুনমুন সেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ ছিলেন! রিয়া-রাইমা মায়ের হয়ে প্রচারে যোগ দিয়েছিলেন। অভিনেতাদের রাজনীতিতে আসা নিয়ে সেই জন্যই কি তাঁর মনে দ্বিধা রয়েছে? দীর্ঘ দিন পরে নিজের শহরে পা রেখে অনর্গল সেন বাড়ির ছোট কন্যা। বললেন, “কলকাতায় সিনেমা, সংস্কৃতি এবং রাজনীতি বরাবরই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। কারণ এখানে শিল্প ও জনজীবন স্বাভাবিকভাবেই একে অপরকে প্রভাবিত করে। আমার মনে হয়, অভিনেতা এবং রাজনীতিবিদদের মধ্যে অনেক মিলও রয়েছে। নানা দিক থেকে, সব অভিনেতাই রাজনীতিবিদ এবং সব রাজনীতিবিদই অভিনেতা।” তার পরেও তিনি মনে করেন, “যদি কোনও রাজনৈতিক পরিবর্তন একটি ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন প্রাণশক্তি, টিমওয়র্ক এবং নতুন ধারণা নিয়ে আসে, তা হলে সেই বদল ভাল। পরিবর্তন এবং নতুনত্বই যে কোনও সৃজনশীল ক্ষেত্রকে সজীব রাখে।” তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি রাজনীতিতে যুক্ত থাকার চেয়ে নিজের কাজে মনোযোগ দেওয়া বেশি পছন্দ করেন। তার জন্য সকলের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখাটাও প্রয়োজন বলে মনে করেন রিয়া।
পরিবর্তিত টলিউড যদি রিয়াকে আবার ডাকে, অভিনেত্রী কি সাড়া দেবেন? দীর্ঘ দিন তিনি বাংলা বিনোদনদুনিয়া থেকে দূরে। এ বার আর ক্ষোভ চেপে রাখতে পারলেন না রিয়া। সপাট বললেন, “কোনও পরিচালক ভরসাই করতে পারেন না, আমিও যে ভাল চরিত্র পেলে নিজেকে উজাড় করে দিতে পারি। সেই ভরসা তো আমার উপরে রাখতে হবে। ঋতুপর্ণ ঘোষ রেখেছিলেন। তাই তাঁর ছবি ‘আবহমান’-এ আমার অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল।” তিনি একা নন, তাঁর দিদি রাইমাকেও টলিউড যোগ্য সম্মান দিতে পারেনি, অনুযোগ রিয়ার। তার পরেই ফাঁস করলেন, “নন্দিতা রায়-শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘ফুলপিসি ও এডওয়ার্ড’ ছবিতে রাইমা খুব ভাল চরিত্র পেয়েছে। যদিও ওই চরিত্র আমার করার কথা ছিল। তখন আমি দেসে ছিলাম না। দিদি কাজ করে বলল, ওঁরা খুব ভাল। কাজ করে তৃপ্তি পেয়েছে।” হয়তো আগামী দিনে তাঁকে নন্দিতা-শিবপ্রসাদের ছবিতে দেখা যেতে পারে, আভাস দিলেন তার।
রিয়ার দাবি, “পারেন না। আর পারেন না বলেই, একই ধারার চরিত্রে আমায় ভাবেন, ডাকেন। সাধে আমি বাংলা থেকে দূরে?” চোখের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়া চুলের গোছা সরাতে সরাতে বলে উঠলেন তিনি, “আপনারা তো আবার সর্বত্র ‘নেপোটিজ়ম দেখত পান!’ সব ইন্ডাস্ট্রিতে যদি ‘নেপোটিজ়ম’ই থাকে তা হলে বলুন, সুচিত্রা সেনের নাতনি, মুনমুন সেনের মেয়ে হয়ে আমি কী পেলাম? আজীবন আপনারা শুধু এই দুটো নামের সঙ্গে আমায় বেঁধে রাখলেন! কাজের কাজ কিচ্ছু হল না।” বলতে বলতে থামলেন রিয়া। বড় করে শ্বাস নিলেন। নিজেকে সামলে উদাহরণ দিলেন তাঁর সঙ্গে ঘটা একটি ঘটনার। নাম না করে জানালেন, এক বাঙালি পরিচালকের হিন্দি সিরিজ়ে তাঁকে কাজের জন্য নেওয়া হয়েছিল। নায়িকা নন, তবে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। রিয়ার কথায়, “শুটিং চলাকালীন আমার বাবা ভরত দেববর্মন প্রয়াত। পরিচালক কিন্তু ছুটি দেননি! পরের দিন আমায় দিয়ে শুটিং করালেন। সেটে গিয়ে দেখি, নায়ক নুডলস খেতে ব্যস্ত। তাঁর খাওয়া হলে শট দিতে গেলাম।” সিরিজের ট্রেলার দেখে রিয়া হতবাক! প্রচার ঝলকের কোথাও নেই তিনি। সে দিন খুব কষ্ট পেয়েছিলেন তিনি।
রূপটান নেওয়া প্রায় সারা। কেশবিন্যাস চলছে অভিনেত্রীর। ওই অবস্থাতেই রিয়া ঘুরে বসলেন। বলে উঠলেন, “আপনারা জানেন না, ‘নেপোটিজম’ নয়, সর্বত্র ‘গ্রুপিসিজ়ম’ চলছে। বাইরে থেকে লোক আসছেন। তাঁরা দল বানাচ্ছেন। সেই দলের লোকেরাই মুঠোভর্তি কাজ পাচ্ছেন। ওই জন্যই একটু আগে বললাম, সকলে যেন কাজ পায়। কিছু মানুষ কাজ পাবেন, কিছু মানুষ বসে থাকবেন, এটা ঠিক?” কিন্তু এই ‘সেন’ পদবিই তো তাঁকে বলিউডে জায়গা করে দিয়েছে? একেবারেই না! তীব্র প্রতিবাদ তাঁর। রিয়ার মতে, তাঁর পরিশ্রম তাঁকে জায়গা করে নিতে সাহায্য করেছে। কথাপ্রসঙ্গে উঠে এসেছে তাঁর সহ-অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুপ্রসঙ্গও। আকস্মিক মৃত্যুর জন্য অনেকেই দায়ী করছেন অভিনেতা যে প্রযোজনা সংস্থার হয়ে কাজ করছিলেন, তাদের অসাবধানতা, অপেশাদার মনোভাবকে। রিয়ারও কি তা-ই মত? অভিনেত্রী বললেন, “আমি বিশ্বাস করি, জন্ম এবং মৃত্যু দুটোই আমাদের ভাগ্যে লেখা থাকে।” একই সঙ্গে তিনি টলিউডকে পুরোপুরি ‘অপেশাদার’ তকমা দিতেও রাজি নন। রিয়া মনে করেন, সেটে শৃঙ্খলা এবং সময় ব্যবস্থাপনার অভাব হয়তো রয়েছে। সেটা না থাকলে রাহুলের পরিণতি এ রকম ভয়াবহ হত না।
টলিউড অপেশাদার নয়। সবাই নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করে এবং আরও ভালো পরিস্থিতিতে কাজ করতে চায়। টলিউড, অর্থাৎ বাংলা সিনেমা থেকে যে কাজগুলো বেরিয়ে আসে, তা সত্যিই অতুলনীয়। তবে আমার মনে হয়, সেটে শৃঙ্খলা এবং সময় ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে।”
লম্বা সময় অভিনয়দুনিয়ায় কাটানোর পরেও মনের মতো কাজ পান না। মনের মতো চরিত্রও। রিয়া কি হতাশ? এখন কি তাঁর মনে হয়, অভিনয়ে না এলেই পারতেন! অভিনয়দুনিয়ায় টিকে থাকতে, আকর্ষণ বজায় রাখতে দর্শক-অনুরাগীদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা উচিত? তাঁর দিদা সুচিত্রা সেন আজীবন যা মেনেছিলেন। রিয়া আবার খোশমেজাজে। কণ্ঠস্বরে কোনও উষ্মা নেই! মিষ্টি হেসে পরিণত উত্তর দিলেন, “এই ইন্ডাস্ট্রিতে আমার জীবনে উত্থান-পতন দুটোই এসেছে। কিন্তু বিদেশে অভিনেতা এবং মডেল হিসেবে কাজ করার সুবাদে আমি খারাপ সময়গুলোকে মেনে নিতে, তার থেকে শিক্ষা নিতে এবং ভাল সময়গুলোকে পুরোপুরি উপভোগ করতে শিখে গিয়েছি।” পরিণত রিয়া বুঝতে শিখেছেন, প্রত্যেক অভিনেতার পথচলা ভিন্ন। সেই পথ নির্ভর করে, তাঁরা কোন পথ বেছে নেন তার উপর। তাঁর কথায়, “এমন অনেক একনিষ্ঠ দর্শক আছেন, যাঁরা আপনাকে দেখে কখনও ক্লান্ত হন না। কিন্তু এখন শুধু সেটাই যথেষ্ট নয়।” তাই তাঁর বিশ্বাস, অতীত কেমন ছিল সে দিকে ক্রমাগত ফিরে না তাকিয়ে সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াটাই ভাল। কারণ, বদল, পরিবর্তন— এ গুলো আসবেই।
ঠিক সেই সময় রিয়ার সঙ্গে দেখা করতে এলেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী তপতী মুন্সী। তিনিও রিয়ার সঙ্গে এই ছবিতে আছেন। তাঁকে দেখেই সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন রিয়া। বর্ষীয়ান অভিনেত্রীর দুটো হাত ধরে আন্তরিক ভাবে জানতে চাইলেন, “কেমন আছ?” সেই আন্তরিকতায় অভিনয়ের ছিটেফোঁটা নেই। বরং চুঁইয়ে পড়েছে সেন বাড়ির শিক্ষা।
তামান্না হাবিব নিশু